শুক্রবার, ২১ মার্চ, ২০১৪

প্রাণের জাগরণ...


৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩ 
সময়টা খুব ধীর গতিতে যাচ্ছে...কিছুতেই শেষ হতে চাচ্ছে না। প্রতীক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চাচ্ছে না। মনের ভিতরে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছে। আর বার বার মনে হচ্ছে...আর কতো দেরী সেই প্রতীক্ষিত রায়টির, কখন শুনবো যে- কসাই কাদের কে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে। কখন টিভির পর্দায় বড় করে হেডলাইন দেবে যে- কুখ্যাত রাজাকার কাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে সেই অন্তিম মুহূর্তটির জন্য।নাহ, আর কিচ্ছু ভালো লাগছে না পড়াশোনা, কাজকর্ম কোনকিছুতেই যেন মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না সেইদিন। এমন অস্থিরতাতেই কেটেছিল আমার সেই দিনটি...
৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩ 

প্রতিদিন মায়ের ডাকেই আমার ঘুম ভাঙে। কিন্তু সেদিন নিজ থেকেই জেগে উঠলাম। ওদিকে মা তাড়া দিতে শুরু করলো কলেজে যাবার জন্য তাড়াতাড়ি তৈরি হতে। কিন্তু সেদিন কিছুতেই আমার কলেজে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও রওনা হলাম কলেজের পথে। তারপর কলেজে গিয়ে ক্লাসে যাবার উদ্দেশে লিফটে উঠলাম। ৫ তলার ৫০৯ নং রুমে আমার ক্লাস। লিফট ৫ তলায় উঠে আবার নিচে নামলো, আমার কোন খবর নেই। শুধু একটাই চিন্তা... কখন শুনবো সেই প্রত্যাশিত রায়!!! কিছুক্ষণ পর এক মামার ডাকে আমার ঘোর কাটল। ওদিকে ফর্ম মাস্টার ক্লাসে চলে গেছে। আমি খুব দ্রুত গেলাম ক্লাসের সামনে। ক্লাসে ঢোকার অনুমতি পেলাম না। একে তো দেরী করে ফেলেছি, তারপর চুলে দুই বেণী নাই, আইডি নাই; মানে খুব খারাপ একটা পরিস্থিতিতে পরলাম। প্রায় ১৫ মিনিট বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। অন্যদিন যদি কখনো আমাকে কোন শাস্তি পেতে হতো, তাহলে কেঁদে একেবারে নাকের জল চোখের জল এক করে ফেলতাম। কিন্তু সেদিন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ ভালোই লাগছিলো। ফর্ম মাস্টারের বকবকানি শুনতে হচ্ছিলো না, একেবারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু একটা প্রতীক্ষাই করছিলাম।
১৫ মিনিট পর ক্লাসে ঢোকার অনুমতি পেলাম। শুরু হল ১ম ক্লাস- পরিসংখ্যান। সেদিনের টপিক ছিল- "দৈব চলকের গাণিতিক প্রত্যাশা"। কিন্তু সেদিন আমার মাথায় আর কোন প্রত্যাশাই কাজ করছিলো না; কারন আমার প্রত্যাশা ছিল একটাই- "কসাই কাদেরের ফাঁসি"। তাই আপন মনে আমি সেই প্রত্যাশার প্রহরই গুণতে লাগলাম। শেষ হল ১ম ক্লাস; শুরু হল ২য় ক্লাস- বাংলা। টপিক ছিল- "একটি ফটোগ্রাফ"। মিস যথারীতি কবিতা বোঝাতে লাগলেন। কিন্তু বইয়ের সেই ফ ফটোগ্রাফ কবিতা আমার কানে যাচ্ছে না । শুধু ফাঁসির কাদেরের ফটোই চোখে ভেসে আসছিলো। এবার ৩য় ক্লাস- একাউনটিং। সেদিন ক্লাসে সবাইকে একটা ফাইনাল অ্যাকাউন্ট করতে বলা হয়েছিলো, সময়- ৩০ মিনিট। অন্যদিন হিসাব মিলে গেলেও সেদিন কিছুতেই মিলছিল না হিসাব। সব হিসাব কেমনযেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো। তারপরেও মেলানোর কোন ইচ্ছেই ছিল না আমার। তখন শুধু বার বার মনে হচ্ছিলো- কাদেরের ফাঁসি দিলেই বুঝি মিলে যাবে হিসাবের কিছুটা অংশ, ৪২ বছরের সেই পুরনো হিসাব...
এমনিভাবেই কেটে গেলো ৬ টি ক্লাস। ছুটি হবার পর খুব দ্রুত বাড়িতে ফিরলাম। ঘরে ঢোকার পরই ছোট ভাইয়ের কাছে জানলাম যে কাদেরের ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হয়েছে। কথাটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না। টিভির সামনে গিয়ে দেখালাম- যে আসলেই তাই...!! সহ্য হচ্ছিলো না; রাগে ঘৃনায় চোখে পানি চলে আসছিলো। মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিলো না। বার বার শুধু মনে হচ্ছিলো - নাহ, এটা হতে পারে না। সারাদিন ঘরের এক কোণে বসে রইলাম। সন্ধ্যার আগে টিভিতে দেখলাম, শাহাবাগে এই রায়ের বিরুদ্ধে লোকজন মানববন্ধন করছে। রাত পোহাতে না পোহাতেই সেই মানববন্ধন রুপ নিলো মানবসমুদ্রে...

একজন, দুজন, একশো জন, হাজার থেকে লাখে ছাড়িয়ে গেলো লোক সংখ্যা। আমি বাবাকে বললাম, " বাবা, আমিও যাবো... " কিন্তু বাবার এক কথা পরীক্ষার আগে কোথাও যাওয়া হবে না। আর যাওয়া হলও না। প্রথমে খুব কষ্ট আর রাগ হয়েছিলো। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিলাম যে- আমি নেই, তাতে কি!!! কোটি প্রানের জাগরন হয়েছে শাহাবাগে। শাহাবাগ জেগে আছে, জেগে থাকবে। জয় আমাদের হবেই...

এদিকে আমার নানা ভাই (বয়স ৭০ ছাড়িয়ে) এই জাগরণ দেখে খুবই খুশি। তিনি নাকি এই জাগরণের মাধ্যমে ৭১ কে ফিরে গিয়েছেন। আমাকে বলছিল, " যদি ঠিক ভাবে হাঁটতে পারতাম, পায়ে ব্যথা না থাকতো তবে আমিও চলে যেতাম ওখানে। "
এমনি করে বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ছোট ছোট শিশুর অকৃত্রিম ভালোবাসায় চলতে থাকলো কোটি প্রানের জাগরণ। শাহাবাগ হয়ে উঠলো প্রজন্ম চত্বর। চলতে থাকলো স্লোগান... সকাল থেকে বিকেল...বিকেল থেকে রাত...আবার রাত থেকে সকাল পর্যন্ত অবিরাম স্লোগান।
ফাঁসি, ফাসি,ফাসি চাই- কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই। রাজাকারদের আস্তানা, এই বাংলায় হবে না। ক তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার, তুই রাজাকার।
এমনি করে প্রতিদিনই যুক্ত হতে থাকলো নতুন নতুন স্লোগান। আর এই অগ্নিঝরা স্লোগানগুলোর সাথে সাথে আমরা ফিরে পেলাম আমাদের প্রানের স্লোগান- " জয় বাংলাকে"। স্লোগানের ধ্বনি ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো... পৌঁছে গেলো শহর থেকে উপশহরে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে... । স্লোগান চলছেই, শহর বাসী ঘুমিয়ে পরে কিন্তু জেগে থাকে শাহাবাগ, জেগে থাকে প্রজন্ম চত্বর, জেগে থাকে ২য় মুক্তিযুদ্ধের মুক্তিযোদ্ধারা।

উত্থাপিত হয় জামাত- শিবির নিষিদ্ধ সহ ৬ দফা দাবি। যার মধ্যে অন্যতম প্রধান দাবি ছিল-" রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পক্ষের আইন জীবীদের আপিলের সুযোগ দিতে হবে।"
অবশেষে জনগনের প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৩ ই ফেব্রুয়ারি সরকার সংসদে " আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধন বিল" উত্থাপন করে। ১৪ ফেব্রুয়ারি এই বিলের ব্যপারে আইন ও বিচার সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির রিপোর্ট আসে। ১৭ ই ফেব্রুয়ারি বিলটি সর্ব সম্মতি ক্রমে গৃহীত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ২১ ধারা সংশোধন করে রাষ্ট্র পক্ষের আপিলের সুযোগ রাখা হয়। আর এটিই ছিল আমাদের প্রানের মঞ্চ " গণজাগরণ মঞ্চের" ১ম বিজয়...
এরপর মার্চের ৩ তারিখ কাদেরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবীরা আপিল করে। ১৭ই সেপ্টেম্বর সেই আপিলের রায়ে কাদেরকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। অবশেষে গত ১২ই ডিসেম্বর এই কুখ্যাত পিশাচ রাজাকার কাদেরের রায় কার্যকর করা হয়। যার মাধ্যমে জাতির কলংক মোচনের ১ম একটি ধাপ রচিত হয়...
এমনি ভাবে একটার পর একটা বিজয়ের পথ পাড়ি দিচ্ছে এবং দিতে থাকবে আমাদের প্রানের মঞ্চ; যদিও সেই পথ খুব বন্ধুর।এই প্রানের মঞ্চ আমাকে শিখিয়েছে কি করে দেশে মন থেকে ভালবাসতে হয়, দেশপ্রেম কাকে বলে... আমার ছোট ভাইটাকে শিখিয়েছে প্রানের স্লোগান "জয় বাংলা"। ঝিমিয়ে পরা দেশ প্রেমকে আবার জাগ্রত করেছে এই মঞ্চ। স্বাধীনতার পর এতো মানুষ কখনই মিলিত হয় নি আমাদের দেশে, একসাথে এতো কণ্ঠের জোরালো স্লোগানও হয়নি, একই দাবীতে একসাথে এতো মানুষের মিলনমেলা আগে কখনো দেখা হয়নি। আমার জন্ম ৭১ এর অনেক পরে, তাই ৭১ কে না দেখার একটা আফসোস সবসময়ই মনে থাকতো; কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চ আমার সেই আফসোস অনেকটাই দূর করে দিয়েছে।
তাই এই মঞ্চ আমার প্রানের মঞ্চ, এই জাগরণ আমার প্রানের জাগরণ। নানা ষড়যন্ত্র, ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে ১ বছরে পা রাখল এই প্রানের জাগরণ। আরও শত শত বছর যেন এভাবেই কোটি মানুষের প্রানের মঞ্চ হয়ে এটা টিকে থাকতে পারে সেই কামনাই করছি। মঞ্ছের১ম বর্ষপূর্তিতে হৃদয়ের গভীর থেকে মঞ্চের জন্য শুভ কামনা করছি...
শাহাবাগ জেগে আছে, জেগে থাকবে কোটি বাঙালির হৃদয়ের মাঝে...জয় বাংলা, জয় প্রজন্ম, জয় গণজাগরণ মঞ্চ।সবশেষে যে দুটি লাইন না বললেই নয়...
হাত দিয়ে বলো সূর্যের আলো রুধিতে পারে কি কেউ!!
শত বাঁধাতেও থামবে না এই গণজোয়ারের ঢেউ ......

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন