শুক্রবার, ২১ মার্চ, ২০১৪

মামনি আমার ক্ষমা করে দিও.......

বেশ কিছুদিন এই জঞ্জালের শহর থেকে দূরে ছিলাম। গিয়েছিলাম আমার দাদুবাড়িতে। সেই চিরচেনা কাঠের বাড়িটি। সেখানে সবকিছুই আগের মতই আছে। আমার খুব প্রিয় পুকুরঘাট, গাছের বাগান, পাখির ডাক, আমার সব আত্মীয়-স্বজন, সব কিছুই আগের মতনই আছে। আমার দাদুবাড়ীতে ঢোকার একটু আগেই আমার খুব খুব খুব কাছের একজনের বাড়ি। আর আমার সেই কাছের মানুষটি হল আমার লক্ষ্মী মামনির বাড়ি। যিনি আমায় খুব ভালোবাসেন। আর দাদু মারা যাবার পর এই মামনি আর দাদীর টানেই আমি গ্রামে যাই। আমার আর মামনির সম্পর্কটা ঠিক ততোটাই গভীর যতোটা গভীর সম্পর্ক আমার মায়ের সাথে।
সারারাত লঞ্চ জার্নির পর খুব ভোরে আমরা গ্রামে পৌঁছাই। আর সেই শিতের ভোরে মামনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করে তার দরজায় দাড়িয়ে। আর যেই মামনি আমাকে দেখতে পায় ছুটে এসে পাগলের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরে। কিযে টান আমার প্রতি মামনির সেটা একমাত্র আমি আর মামনিই বুঝি। তারপর আমার সাথে কথা বলে বাবা, মা, ছোট ভাই দুটির খবর নেয়া থেকে শুরু করে আরও কতো প্রশ্ন যে মামনি করে....

আমাদের সাথে মামনিদের সম্পর্ক অনেক আগে থেকে। আমার দাদুর মা দাদুকে ৭ মাস বয়সে রেখে মারা যান। তারপর মল্লিক দাদু মানে মামনির বাবার মায়ের বুকের দুধ খেয়ে আমার দাদু বড় হয়েছিলো। তখন মল্লিক দাদুর বয়স ছিল ৯ মাস। মল্লিক দাদুর সাথেই দাদু বড় হয়েছে। শুনেছি দাদুরা নাকি এক থালায় ভাত খেত। মল্লিক দাদুর মাকে আমার দাদু মা বলে ডাকতো। তিনি নাকি আমার দাদুকে নিজ হাতে গোসল করানো থেকে শুরু করে একেবারে যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন পর্যন্ত নিজের পেটের সন্তানের মতো আগলে রেখেছে। কখনো মায়ের অভাব বুঝতে দেয় নি।
দাদুর মুখে শুনেছি একবার আমাদের ক্ষেতের ফসলে মড়ক লেগেছিল। সে বছর দাদুদের খুব অভাব ছিল। তখন মল্লিক দাদুরা আমাদের অনেক সাহায্য করেছিল। সেবছর ঈদে দাদুদের তাদের বাবা নতুন জামা কিনে দিতে পারিনি। তারপর মল্লিক দাদুর মা যখন এই কথা শুনেছিল নিজের সবুজ রঙের একটা শাড়ি কেটে তাদের জামা বানিয়ে দিয়েছিলো। এরকম আরও কতো ঘটনা যে আমাদের এই দুই পরিবারের সাথে জরিয়ে আছে সেটা লিখতে গেলে হয়তো এই লেখাটাই আর শেষ হবে না।
আমরা প্রতি বছর যখন গ্রামে যাই লক্ষ্মী মামনি আমার জন্য আগে থেকেই আমার খুব পছন্দের নারিকেলের লাড্ডু বানিয়ে রাখে। আর সেই লাড্ডুতে কি যে এক স্বাদ লুকিয়ে থাকে যেটা না খেলে বোঝা যাবে না। আমি বরাবরই একটু উদাস। নিজের খেয়াল এখনো ঠিকভাবে রাখি না, আর এই নিয়ে মামনির যে কি চিন্তা তা বলার নেই। গ্রামে গেলেই মামনি কিযে যত্ন করে প্রতিদিন আমার চুল গুলোকে আঁচড়ে দেয় সেটা আমি লিখে বোঝাতে পারবো না। একটু বিকেল হলেই শুরু হয় মামনি আর মা-কাকিদের গল্প। বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে যতো দুনিয়ার কথা আছে সব থাকে সেই গল্পে। আর সেই কি হাসি তাদের।
আর গ্রামে গেলে আমাদের সব দায়িত্ব মামনির। তখন মা আর কাকিদের কোন দায়িত্ব নেই। আর সুযোগ পেলে তো দায়িত্ব নেবেন । কারন তখন দশভুজার মত মামনিই একা সবদিক সামলান।
এবার আসার সময় মামনি বলছিল হয়তো পরের বছর তারা এখানে নাও থাকতে পারে। কারন এই দেশের মানুষ নাকি তাদের আপন করে নিতে পারেনি, এই দেশের মানুষ চায়না তারা এখানে থাকুক। কারন এটা মুসলমানদের দেশ। এখানে হিন্দুরা কেন থাকবে!!! মামনির ভাষায়- "মাগো, ভালো থাইকো, মোরা মনকয় এই দ্যাশে থাকবার পারমু না। এই দ্যাশ মোগো পানে না। এই দ্যাশ হইল মুসলমানগো পানে।"
মামনি যখন কথাগুলো বলছিল তখন তিনি অঝোরে কাঁদছিল। আমি মা কাকি আমাদের সবার চোখেই পানি। কিযে অসহ্য এক যন্ত্রণায় তখন ভুগছিলাম সেটা আমি বোঝাতে পারবো না। তখন নিজের প্রতি নিজের লজ্জা হচ্ছিলো,ঘৃনায় বিষিয়ে উঠছিল মনটা। ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো নিজেকে এই ভেবে "কেন আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ"।
যেই মামনিদের পরিবার আমাদের পরিবারটাকে এককালে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে সেই মামনিদের আজ আমরা সংখালঘু বলে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি। যেই মামনিরা অভাবে আমাদের মুখে ভাত তুলে দিয়েছে তাদের মুখের ভাত আমরা কেড়ে নিচ্ছি, যেই মামনিরা আমাদের বিপদ আপদে সবসময় পাশে থেকেছে তাদের আজ আমরা ঠেলে দিচ্ছি নিশ্চিত বিপদের মুখে!!!
হায় সমাজ!! হায়রে মানবতা!!! এটাই কি তোমাদের কাছে পাওনা ছিল আমার মামনির!!?? আর তা-ই যদি হয় আমি মানি না এই সমাজকে যেই সমাজে আমার মামনিকে "সংখ্যালঘু" বলা হয়। আমি মানিনা সেই মানবতাকে যেখানে আমার মামনিকে নির্যাতিত হতে হয়। আমি মানিনা কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ আর সংখ্যালঘুর নীতিকে। আর আজ যদি আমার মামনিকে সংখ্যালঘু বলা হয় তাহলে আমি বলতে চাই " আমিও সংখ্যালঘু" । কারন মামনি আমার মা আর মা সংখ্যালঘু হলে সন্তানও তো সংখ্যালঘুই হবে।
আর সবশেষে ক্ষমা ভিক্ষা চাইছি সেসব মামনির কাছে যারা আজ তাদের ভিটা মাটি ছেড়ে চরম কষ্টে দিনযাপন করছেন খোলা আকাশের নিচে। জানিনা আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন কি না!!!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন